বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬ | চৈত্র ১৯, ১৪৩২

বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
চৈত্র ১৯, ১৪৩২

দেশের কৃষিখাতে পিছিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার

শাহাদত হোসেন

প্রকাশিত: ২০২৩-০১-১২ ২১:৪১:০৫

বর্তমান বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের কৃষিখাতে ব্যবহার করছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। আর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে তাদের কৃষি ব্যবস্থা। বীজতলা থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে রয়েছে প্রযুক্তির পর্যাপ্ত ব্যবহার। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ছে অন্যদিকে তেমনি উৎপাদন ব্যয় ও ফসলের অপচয় কমছে। সেই তুলনায় দেশের কৃষিখাতে প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে সীমিত কৃষিজমিতে চাহিদা অনুযায়ী ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হলে কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। তারা মনে করছেন, দেশে কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহারে সম্ভাবনা থাকার পরও এখনো প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ে কৃষকরা প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃষিকাজ করে। এর জন্য কৃষিতে অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি খাতকে টেকসই প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশের আয়তন ১৪ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন হেক্টর, যার প্রায় ৮ দশমিক ৫২ মিলিয়ন হেক্টর জমি চাষাবাদে ব্যবহৃত হয়। আর প্রতি বছর দেশের চাষযোগ্য জমি প্রায় শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে। যা বর্ধিত জনসংখ্যাকে নাগরিক সুবিধা প্রদানে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে খাদ্য চাহিদা। ফলে দেশের জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্য চাহিদা পূরণে সরকার গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি একর জমিতে ফসলের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। এর জন্য কৃষিখাতে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিশক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক মো. রোস্তম আলী বলেন, বর্তমানে অধিক জনসংখ্যার বিপরীতে সীমিত কৃষিজমিতে চাহিদা অনুযায়ী ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হলে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বা প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে ফসলের মৌসুমে যেমন সম্পূর্ণ প্রযুক্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে তেমনি প্রয়োজন শস্য সংগ্রহের পর পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও বাজার ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু তদারকি। 

খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য মতে, ১৯৬১-৬৩ সাল থেকে ১৯৯৭-৯৯ সালের মধ্যে বিশ্বে মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার পরও খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ। 

বিশ্বে উন্নত রাষ্ট্রগুলো প্রতিনিয়ত কৃষিতে যোগ করছে যুগোপযোগী প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে মনিটরিং ও পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন ধরনের সেন্সর প্রযুক্তি। সেই সঙ্গে মাটির পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ জানা, কৃষি জমিতে পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, পোকামাকড় নিধনে সার ও কীটনাশকের সঠিক ব্যবহারের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হচ্ছে জিপিএস ও জিআইএস ট্র্যাকিং পদ্ধতি। এ ছাড়া বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র ও তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে অল্প সময়ে ফলের মিষ্টতা, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আকৃতি নির্ণয় করে ফসলের গুণগত ও পরিমাণগত বিষয় নিশ্চিত করা যায়। অন্যদিকে বাজার ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানির ক্ষেত্রে মান নিশ্চিতকরণের জন্য ইন্টারনেট অফ থিংস (আইওটি) ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক দেশে কৃষিতে ড্রোন ব্যবহার হচ্ছে। কীটনাশক ছিটানো থেকে শুরু করে খামার বা জমি মাপতে, পুরো দেশের ফসলের অবস্থা ও খামার পরিচালনার জন্য ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছে।

দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান কমতে শুরু করেছে। গত একদশকে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কর কমিশনার এস এম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, ২০১০-১১ অর্থবছরে কৃষিতে জিডিপির অবদান ছিল ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে আরও কমে এসে দাঁড়ায় প্রায় ১২ শতাংশে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশের মোট আবাদি জমির ৯০-৯২ শতাংশে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ফসলের ৫৪৫ উচ্চ ফলনশীল জাত এবং ৫০৫টি ফসল উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ৮৮টি ইনব্রিড ও ৬টি হাইব্রিড ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। আর বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ ফসলের ১০৮টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। তবে দেশে কৃষি যন্ত্রপাতি এখনো ভারি শিল্পের অংশ। একে কৃষিভিত্তিক শিল্পের আওতায় আনতে হবে।

দেশের কৃষিব্যবস্থাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক, বাণিজ্যিকীকরণ ও আধুনিকীকরণের জন্য ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পটি গত ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ৫ বছর মেয়াদের প্রকল্পটি জুন-২০২৫ পর্যন্ত চলবে। চলমান ২০২০-২১ অর্থবছরে এ প্রকল্পের অধীনে বরাদ্দপ্রাপ্ত ২০৮ কোটি টাকার মাধ্যমে সারা দেশে ১৭৬২টি কম্বাইন হারভেস্টার, ৩৭৯টি রিপার, ৩৪টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ প্রায় ২ হাজার ৩০০টি বিভিন্ন ধরনের কৃষিযন্ত্র কৃষকের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।

কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) সূত্র মতে কৃষি ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগও বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আইসিটির কার্যক্রমগুলো হলো- কৃষি তথ্য যোগাযোগ কেন্দ্র (এআইসিসি), কৃষি আলাপনি (এসএসএস/এমএমএস), কমিউনিটি রেডিও, প্রমোশনাল টিভি, ভিডিও কনফারেন্সিং, ইন্টার অ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স (আইভিআর), দেশের সর্ববৃহৎ কৃষি তথ্যভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল ও সার্ভার www.ais.gov.bd  ওয়েবসাইট প্রবর্তন।

বাংলাদেশ কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) সূত্রে বিআরআরআইয়ের মহাপরিচালক জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস জানান, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সারাদেশে দ্রুত কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে  দিতে ‘আরসিএম’ অ্যাপ ব্যবহার করে জমির উর্বরতা শক্তির মাত্রা অনুযায়ী কখন ও কতটুকু সার দিতে হবে, প্রত্যাশিত ফলনের জন্য চারার বয়স কত হবে, বীজ বপন ও চারা রোপণের কৌশল ও পদ্ধতি কী হবে, আগাছা ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের জন্য কখন কী করতে হবে-ধান চাষের এসব জরুরি পরিচর্যার বিষয়ে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার জন্য www.krishimarket.com  নামে অনলাইন কৃষি বাজার চালু করেছে।

অধ্যাপক রোস্তম আলী বলেন, আমাদের দেশে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রধান অন্তরায় প্রান্তিক কৃষকের কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের অনুপযোগী ছোট কৃষিজমি, যেখানে মানসম্মত কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায় না। দেশের প্রান্তিক কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবেও অসচ্ছল। তাদের উচ্চমূল্যে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সামর্থ্য নেই। এ ছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। বিগত দশকগুলোতে বাংলাদেশ সফলভাবে তার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে টেকসই করেছে এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় উচ্চতর সূচক অর্জন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষির আধুনিকায়নে সরকার নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

SStv