পিডি'র স্বাক্ষর জাল করে প্রতারণা, হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা
শাহাদত হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি ::
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ওরাসকম লিমিডেট। বিদেশী এই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদারির কাজ করে যাচ্ছে। নানা অভিযোগ থাকায় দেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি । স্বাক্ষর জালিয়াতি, বড় বড় প্রকল্পের ভুয়া কার্যাদেশ তৈরি, প্রতাণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা, শ্রমিকদের মারধর, বিদেশে টাকা পাচারসহ রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার মতো অভিযোগ। আরো অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি সময়ে ওরাসকমের বাংলাদেশে রিপ্রেজেনটিভ কাউসার আলম চৌধুরীর একটি প্রতারণার কারণে মেট্রোরেল লাইন-১ কাজ ডুবতে বসেছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি মেট্রোরেল লাইন ওয়ানের টেন্ডার প্যকেজ-৮ ( সিপি-৮) এর একজন প্রকল্প পরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া কন্ট্রাক্ট প্যাকেজের নোটিফিকেশন (কার্যাদেশ) জারি করে ওরাসকম। সেই জারিকৃত কার্যাদেশ দেখিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভুয়া চুক্তি করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় বাস্তবায়নাধীন ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট লাইন-১ এর প্রকল্প পরিচালক কাসেম ভূঁইয়া তার স্বাক্ষর জালিয়াতি ও ভুয়া কার্যাদেশ তৈরির সততা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে পিডি কাসেম ভূঁইয়া রমনা থানায় একটি সাধারণ জিডি করেন। জিডি নং ৭৪৪।
ডিজি থেকে প্রাপ্ত সূত্রে মতে, ওরাসকম লিমিটেড মেট্রোরেল লাইনের ১ (সিপি ৮) অংশগ্রহণ করেন ওরাসকম। মূল্যায়ন কমিটির সভায় তাদের বাতিল করা দেয়া হয়। এর পরবর্তীতে মেট্রোরেল লাইন- ১ প্রকল্প পরিচালক কাসেম ভূঁইয়া স্বাক্ষর করে কার্যাদেশ তৈরী করেন। সেই কার্যাদেশ দেখিয়ে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ দেয়ার নাম করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এরকম ভুয়া কার্যাদেশের মাধ্যমে ওরাসকমের সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠান যেনো কাজের চুক্তিনামা করে অগ্রীম টাকা লেনদেন না করার বিষয়ে সতর্কতা ডিজিতে উল্লেখ্য করা হয়েছে।
এ বিষয়ে এমআরটি লাইন-১ এর প্রকল্প পরিচালক কাশেম ভুইঁয়া জানান, এই প্রকল্পের কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ -৮ এর কোনো প্রি- কোয়ালিফিকেশন মূল্যায়নের নোটিফিকেশন পত্র জারি না করার আগেই আমার স্বাক্ষর জাল করে ওরাসকম নিজেদের নামে ভুয়া প্রি- কোয়ালিফিকেশন মূল্যায়নপত্র তৈরি । পরে তারা এই ভুয়া প্রি- কোয়ালিফিকেশন মূল্যায়নপত্র দেখিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে বলে শুনতে পেরেছি। আমার স্বাক্ষর জাল করায় আমি একটি সাধারণ ডায়েরী করেছি। উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। কাসেম ভুইঁয়া আরো জানান, আমি মনে করি এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। কারণ এই জালিয়াতি করে তারা প্রশ্রয় পেয়ে গেলে আরও বড় ধরণের জালিয়াতি ঘটাবে।
এছাড়াও কাজ দেয়ার নাম করে যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে এমন বেশ কয়েকটি ভুক্তভোগী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিক এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ ০৮ ওরাসকম কোয়ালিটি পূর্ণ না হওয়ার কারণে মূলায়ন কমিটি তাদের বাতিল করে দেয়। তারপরেও তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে আমাদের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিনামা করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রথমে ওরাসকম আমাদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য মেট্রোরেল লাইন-১ কাজের কার্যাদেশের চুক্তি নাম্বার দেখাই। সেটা বিশ্বাস করার আমরা অগ্রীম টাকা দিয়ে এখন প্রতারণা ফাঁদে পড়ছি। এখন ওরাসকম অন্য প্রকল্পের কাজ দেয়ার কথা বললেও সেটা করছে না আবার টাকা ফিরত দিচ্ছে না।
সূত্র জানায়, ভুয়া কার্যাদেশ ও চুক্তিনামা করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। দৈনিক যায়যায়দিনের হাতে এসেছে এমন বেশ কিছু নথিপত্র। যার মধ্যে রয়েছে, আলম ট্রেডার্স, তাইবা ট্রেডার্স, সরকার আউটসোর্সিং, জেনেক্স ইনফেকশন লিমিটেড, মক্কা-মদিনা ইন্টারন্যাশনাল। এ সকল প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার নামে বিভিন্ন সময় বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। এর মধ্যে আলম ট্রেডার্স এর কাছ থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকার চুক্তিনামা সম্পন্ন করেছে। আলম ট্রেডার্স কাছে অগ্রীম নিয়েছেন ২০ লাখ টাকা। তাইবা ট্রেডার্স সঙ্গে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা চুক্তিনামা অগীম নিয়েছেন ১০ লাখ টাকা। সরকার ট্রেডিং ও আউটসোসিং কাছ থেকে ম্যানপাওয়ার চুক্তিনামায় অগ্রীম নিয়েছে ৫ লাখ টাকা। মক্কা-মদিনা ট্রেডার্স এর কাছ থেকে পাথর ও বালু নেওয়ার জন্য চুক্তি করেছিল। মক্কা-মদিনা কাছ থেকে নিয়েছে অগ্রিম ২০ লাখ টাকা। এছাড়াও আরো ডজন দু''য়েক প্রতিষ্ঠানের থেকে ভুয়া চুক্তিনামা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওরাসকম যেসকল কোম্পানিকে কার্যাদেশের চুক্তিনামা দেখিয়েছে সেটা মিথ্যা। যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, চুক্তিনামাটি ভুয়া। জালিয়াতির মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভুয়া প্রত্যয়ন ইস্যু দেখিয়েছে ওরাসকম। বিষয়টি জানাজানির পর ঠিকাদারদের চাঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও অনুসন্ধ্যানে আরও কিছু চাঞ্চলকর তথ্য ও অভিযোগ পাওয়া গেছে ওরাসকমের বিরুদ্ধে। স্বাক্ষর জালিয়াতি পাশাপাশি, ভুয়া কার্যাদেশ বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া, শ্রমিকদের মারধর, বিদেশে টাকা পাচারসহ রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আজাদ রহমান জানান, প্রতারণা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে সিআইডি । যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি বিদেশী তাই দেশে থেকে টাকা পাচারের অভিযোগ উড়িয়ে দেয়ার মতো না। যদি প্রতিষ্ঠানটি প্রতারণা ও মানিলন্ডারিং কাজে জড়িত থাকে তাহলে তদন্তের মাধ্যমে এর পিছুনের রাঘব বোয়ালদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের বিশেষ তদন্ত বিভাগের মহাপরিচালক মীর মোঃ জয়নুল আবেদীন শিবলী জানিয়েছেন, ওরাস কমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলো বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে ওরাসকমের বাংলাদেশের রিপ্রেজেনভিট কাউসার আলম চৌধুরী জানান, ওরাস কমের নামে কেউ যদি ভুয়া কার্যাদেশ বানাই এর দায়ভার তো ওরাসকম নিবে না। আমাদের নাম ভাঙ্গিয়ে কেউবা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। এজন্য আমরা থানা সাধারণ ডায়েরি করেছি। চুক্তি নামায় আপনার স্বাক্ষার ও যে যে প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা নিয়েছেন সেসব প্রতিষ্ঠান মালিকপক্ষ সরাসরি আপনার নাম উল্লেখ্য করেছে জানতে চাইলে, তিনি কোনো সৎ উত্তর দিতে পারেনি। বরং তিনি এ প্রতিবেদককে মানহানির মামলা ভয় দেখিয়ে নিজের ক্ষমতা দেখান।
এছাড়াও মানিলন্ডারি ও শ্রমিকদের মারধরসহ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানা, ন আমরা যা করেছি ব্যাংকের মাধ্যমে করেছি। মানি লন্ডারিং কোনো প্রমান প্রশাসনের কাছে নেই। এছাড়াও শ্রমিকদের মারধরের কোনো প্রশ্নই আসে না। এমনকি আমরা কখনো কোনো আওয়ামীলীগ নেতাকে টাকা নিয়ে ম্যানেজের মাধ্যমে কোনো কাজ ভাগিয়ে নেয় নাই ।
এই বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশেষ করে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো সুকৌশলে মানি লন্ডারী করে যাচ্ছে। যা অনেকটাই ধরাছোঁয়ার বাহিরে। এক্ষেত্রে তাদের কোনো ডকুমেন্টেশন পাওয়া যায় না। যদি এই ধরণের অভিযোগ আসে তাহলে দুদকের উচিত এই বিষয়ে অনুসন্ধান করা। তিনি আরো জানান, যদি ওরাসকম বা প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এরকম কোনো তথ্য পাওয়া যায় তাহলে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে তাদের উপর নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।